ভূমিকা : ২৫ আগস্ট ২০১৭ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (ARSA) যোদ্ধারা
মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে ৩০টির মতো পুলিশ ও সেনা চৌকিতে
হামলা চালায়। এতে ১২ পুলিশ সদস্য নিহত হয়। এর পর থেকে রাখাইন রাজ্যজুড়ে শুরু হয়
‘অপারেশন ক্লিয়ারেন্স’ নামের বর্বর ও নিষ্ঠুরতম এক সেনা অভিযান। পৃথিবীর
সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু জাতির নাম রোহিঙ্গা। জাতিসংঘ তার এক প্রতিবেদনে
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে
‘বিশ্বের সবচেয়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী’ হিসেবে
আখ্যায়িত করে। ‘উদ্বাস্তু’ ও ‘বন্ধুহীন’ এবং বিশ্বের একমাত্র
রাষ্ট্রহীন নাগরিক ভাগ্যবিড়ম্বিত রোহিঙ্গারা।
স্বাধীন আরাকান ও রোহিঙ্গা : স্বাধীন ও সমৃদ্ধ এক জনপদের নাম ছিল আরাকান।
বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর দক্ষিণ-পশ্চিম মোহনাবেষ্টিত আরাকান-ইয়োমা নামের দীর্ঘ
পর্বতশৃঙ্গ আরাকানকে মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা করেছে। আরাকানের
প্রাচীন নাম ব্রহ্ম জনপদ, বর্তমানে রাখাইন। ইতিহাস বলছে, ১৪৩০ – ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত
২২,০০০ বর্গমাইল আয়তনের আরাকান
(পরবর্তীকালে মিয়ানমার সরকার এ অঞ্চলকে দুটি প্রদেশে ভাগ করে) স্বাধীন
রাজ্য ছিল। ১৮২৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎকালীন বার্মা দখল করার পর ১৮২৬
সালে আরাকান ব্রিটিশ ডোমিনিয়নের অংশে পরিণত হয়। ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮ বার্মা স্বাধীনতা
লাভ করলে আরাকান স্থায়ীভাবে দেশটির অংশ হয়। ১৯৮১ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা
আরাকান রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করে রাখাইন প্রদেশ। ইতিহাস ও ভূগোল
বলছে, রাখাইন প্রদেশে প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ বছর আগে পূর্ব ভারত থেকে অস্ট্রিক
জাতির একটি শাখা কুরুখ নৃগোষ্ঠী প্রথম বসতি স্থাপন করে। ক্রমান্বয়ে বাঙালি হিন্দু
(পরবর্তীকালে ধর্মান্তরিত মুসলিম), পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, পাঠান এবং অষ্টম
শতাব্দীতে আরবরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। এসব নৃগোষ্ঠীর
সংকরজাত জনগোষ্ঠীই হলো এ রোহিঙ্গা। নবম-দশম শতাব্দীতে আরাকান রাজ্য
‘রোহান’ কিংবা ‘রোহাঙ’ নামে পরিচিত ছিল। সেই অঞ্চলের অধিবাসী
হিসেবেই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের উদ্ভব। বস্তুত রোহিঙ্গারা আরাকান বা রাখাইনের
একমাত্র ভূমিপুত্র জাতি।
রোহিঙ্গা সংকটের সূত্রপাত : আরাকান রাজ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে
রোহিঙ্গারা। তারা আরাকানে বহিরাগত নয়, বরং বর্মী রাজারাই আরাকানের দখলদার।
মিয়ানমারের সংবিধানে বুনিয়াদি জাতির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাতেও রোহিঙ্গারা
মিয়ানমারের একটি বুনিয়াদি জাতি। কিন্তু সব ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ চাপা দিয়ে আর
বাস্তবতা উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন করে বলা হচ্ছে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়,
তারা বহিরাগত। বর্বর বর্মী সরকার বার বার এ অভিযোগ উত্থাপন করে যে, রোহিঙ্গারা
ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সদ্য অভিবাসিত একটি উপজাতি। অতএব তাদেরকে স্থানীয় আদিবাসী
গণ্য করে বর্মী শাসনতন্ত্র অনুযায়ী বার্মার নাগরিকত্ব দেয়া যায় না। মূলত বার্মার
প্রকৃত নাগরিক না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের বার বার দেশ থেকে বিতাড়নের ঘটনা ঘটছে।
ব্রিটিশরা তৎকালীন বার্মার স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর যে তালিকা
প্রস্তৃত করে তাতে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেনি। আর এ থেকেই সংকটের
সূত্রপাত। উদ্ভূত এ সমস্যার পিছনে একক কোনো কারণ নিহিত নয়, এর পিছনে রয়েছে আরো
একাধিক কারণ ও ইতিহাস। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. আরাকানের পতন : ১০৪৪ সালে স্বাধীন আরাকান রাজ্য দখল করে কট্টর বৌদ্ধ
বর্মী রাজা আনাওহতা। তিনি মগদের বার্মা থেকে এনে দক্ষিণাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের
বিতাড়িত করে বৌদ্ধ বসতি স্থাপন করেন। এরপর ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান ছিল স্বাধীন
রাজ্য। ১৬৬০ সালে আরাকানের রাজা চন্দ্র সু ধর্মা কর্তৃক মোগল রাজপুত্র শাহসুজাকে
হত্যার মধ্য দিয়ে আরাকানের পতন শুরু হয়। ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রামের পতনের পর আরাকান
রাজ্য সংকুচিত হয়ে একটি ছোট অঞ্চলে পরিণত হয় এবং রাজনৈতিকভাবে বেশ অস্থিতিশীল হয়ে
ওঠে। ১৭৩১ – ১৭৮৪ সালের মধ্যে আরাকান রাজ্যকে ১৩ জন রাজা শাসন করেন যাদের গড়
শাসনকাল দুই বছরের বেশি ছিল না। আরাকানি সামন্ত রাজাদের মধ্যে কোন্দলের সুযোগে
১৭৮৫ সালের প্রথম দিকে মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এটি দখল করে বার্মার (মিয়ানমার)
করদ রাজ্যে পরিণত করে।
২. বার্মার স্বায়ত্তশাসন : ১৯৩৭ সালে বার্মাকে হোম রুল বা স্বায়ত্তশাসন
দেয়া হয় এবং ব্রিটিশরা পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের বাদ দিয়ে বর্মীদের হাতে ক্ষমতা
তুলে দেয়। ফলে বার্মায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪২ সাল
পর্যন্ত মধ্য ও দক্ষিণ বার্মা বিশেষ করে আরাকানে অসংখ্য দাঙ্গা-হাঙ্গামা সংঘটিত
হয়। এতে প্রায় এক লাখ মুসলমান নিহত এবং রোহিঙ্গারা অনেকেই নিজ নিজ ঘরবাড়ি থেকে
বিতাড়িত হয়। ব্রিটিশদের তাড়াবার লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে বর্মীরা
জাপানিদের পক্ষাবলম্বন করে। জাপানিদের আচরণ আরো তিক্ততার মনে হলে তারা মত
পরিবর্তন করে ব্রিটিশদের সহায়তা করে। এর বিনিময়ে বার্মা ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি
স্বাধীনতা লাভ করে।
৩. ১৯৪২ সালে রোহিঙ্গা হত্যা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে ১৯৪২
সালে, জাপানিরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে বার্মা দখল করে নেয়। স্থানীয় রাখাইনরা এ সময়
জাপানিদের পক্ষ নিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত জনগণকে আক্রমণ করে।
তাদের আক্রমণের শিকার হয় মূলত (রোহিঙ্গা) মুসলমানরা। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ রাখাইন
অধ্যুষিত মিমবিয়া ও ম্রোহাং টাউনশিপে প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করে
রাখাইনরা।
৪. রোহিঙ্গাদের পাল্টা প্রতিশোধ : রোহিঙ্গা হত্যার পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে
রোহিঙ্গারা উত্তর রাখাইন অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার রাখাইনকে হত্যা করে। সংঘাত তীব্র
হলে জাপানিদের সহায়তায় রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের কোণঠাসা করে ফেলে। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত
মিয়ানমার জাপানিদের দখলে থাকে। এ তিন বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার
ছেড়ে তৎকালীন বাংলায় চলে আসে। সে যাত্রা এখনো থামেনি। ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশরা আবারও
মিয়ানমার দখল করে নেয়। এই দখল তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে রোহিঙ্গারা। ব্রিটিশরা এ
সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে সহায়তার বিনিময়ে উত্তর রাখাইনে মুসলমানদের জন্য আলাদা
একটি রাজ্য গঠন করে দেবে তারা। কিন্তু আরো অনেক প্রতিশ্রুতির মতোই ব্রিটিশরাজ এ
প্রতিশ্রুতিও রাখেনি।
৫. নে উইনের ক্ষমতা দখল : ১৯৬২ সালে সামরিক শাসক নে উইন মিয়ানমারের ক্ষমতা
দখল করেন। ক্ষমতা গ্রহণ পরবর্তী পর্যায়ে সেনাপ্রধান নে উইন রোহিঙ্গা মুসলমানদের
প্রতি কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেন এবং ইতোপূর্বে স্বীকৃত অধিকার ও সুবিধাসমূহ বানচাল
করে দেন। নে উইন বার্মার প্রচলিত বহু দলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও বাতিল করে দেন।
একমাত্র দল বার্মা সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টির নেতৃত্বে দেশে সমাজতন্ত্র
প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের কথা বলার যে সুযোগটুকু
অবশিষ্ট ছিল তাও তিরোহিত হয়।
৬. ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন পাস : ১৫ অক্টোবর ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক
জান্তা নাগরিকত্ব আইন প্রকাশ করে। এই আইনে মিয়ানমারে তিন ধরনের নাগরিকত্বে বিধান
রাখা হয়- পূর্ণাঙ্গ, সহযোগী এবং অভিবাসী। এ নতুন আইনে বলা হয়, ১৮২৩ সালে
মিয়ানমারে ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে মিয়ানমারে বাস করা ১৩৫টি
গোত্রভুক্ত মানুষই মিয়ানমারের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে। রোহিঙ্গাদের
গোত্র হিসেবে অস্বীকার করে সামরিক সরকার। আইনে ‘সহযোগী নাগরিক’ হিসেবে
শুধু তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়, যারা ১৯৪৮ সালের নাগরিকত্ব অ্যাক্টে ইতোমধ্যেই
আবেদন করেছে। এছাড়া ‘অভিবাসী নাগরিক’ (মিয়ানমারের বাইরে জন্ম নিয়েছে এমন
মানুষদের নাগরিকত্ব) হিসেবে কয়েকটি শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়, সেগুলো
‘যথাযোগ্যভাবে প্রমাণসাপেক্ষ’ বলে বলা হয়, যারা মিয়ানমারের স্বাধীনতার আগে
(৪ জানুয়ারি ১৯৪৮) এ দেশে প্রবেশ করেছে, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ভাষায় দক্ষ এবং
যাদের সন্তান মিয়ানমারে জন্মগ্রহণ করেছে, তারাই এ ধারায় নাগরিকত্ব পেতে
পারে।
৭. নাগরিক কার্ড থেকে বঞ্চিত : ১৯৮৯ সাল থেকে মিয়ানমার তিন ধরনের নাগরিক
কার্ডের প্রচলন করে। পূর্ণাঙ্গ নাগরিকদের জন্য গোলাপি, সহযোগী নাগরিকদের জন্য নীল
এবং অভিযোজিত নাগরিকদের জন্য সবুজ রঙের কার্ড দেয়া হয়। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য,
পড়াশোনা-চিকিৎসাসেবাসহ সব ধরনের কাজকর্মে এ কার্ডের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু
রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের কার্ড দেওয়া হয় না। এর ফলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে মিয়ানমারে
টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে।
৮. নির্দিষ্ট গ্রামে বন্দি : মিয়ানমার জান্তা রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে
স্বীকার করে না। আর তাই ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত এসব রোহিঙ্গাকে রাখা হয়েছে
কারাগারে। না, আট লাখ রোহিঙ্গাকে বন্দী করার মতো বড় কারাগার মিয়ানমার তৈরি করতে
পারেনি, তাই রোহিঙ্গারা নিজ গ্রামেই বন্দী। মিয়ানমারের অন্য কোনো অঞ্চলে যাওয়ার
কথা তো দূরূহ, পাশের গ্রামে যাওয়ারও কোনো অনুমতি নেই তাদের। নিজ গ্রামের বাইরে
যেতে হলে তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার কাছ থেকে ট্রাভেল পাস নিতে হয়। এ
ট্রাভেল পাস নিয়েই তারা গ্রামের বাইরে যেতে পারে। কিন্তু ট্রাভেল পাস পাওয়া কঠিন
বিষয়। এ জন্য নাসাকাকে দিতে হয় বড় অঙ্কের ঘুষ। তার পরও রক্ষা নেই। যদি ট্র্যাভেল
পাসে উল্লিখিত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজ গ্রামে ফিরতে ব্যর্থ হয় কোনো রোহিঙ্গা,
তা হলে তার নাম কাটা যায় এ গ্রামের তালিকাভুক্তি থেকে। সে তখন নিজ গ্রাম নামের
কারাগারেও অবৈধ হয়ে পড়ে। তাদের ঠাঁই হয় জান্তা সরকারের জেলখানায়।
৯. বিয়েতে বাধা : ১৯৯০ সালে আরাকান রাজ্যে স্থানীয় আইন জারি করা হয়।
আইনটিতে উত্তর আরাকানে বাস করা মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিয়ের আগে সরকারি অনুমোদন নেয়া
বাধ্যতামূলক করা হয়।
১০. জন্মনিয়ন্ত্রণ : ২০০৫ সালে নাসাকা বাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। এ সময়
দীর্ঘদিন বিয়ে সংক্রান্ত আবেদন গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয় নাসাকা। পরের বছর যখন আবার
আবেদন গ্রহণ চালু হয়, তখন নিয়মকে করা হয় আরো কঠোর। তখন থেকে আবেদনের সাথে
নবদম্পতিকে মুচলেকা দিয়ে বলতে হয় যে এ দম্পতি দুইয়ের অধিক সন্তান নেবে না।
১১. চিকিৎসা ও শিক্ষায় সীমিত অধিকার : রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারের নাগরিক
অধিকার অনেক দূরের ব্যাপার। সরকারি চাকরি তাদের জন্য নিষিদ্ধ। উত্তর আরাকানের
সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোহিঙ্গাদের জন্য নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসেবা চালু
আছে। কিন্তু এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাখাইন এবং বার্মিজ নাগরিকরা স্থানীয় রাখাইন
ভাষায় কথা বলার কারণে রোহিঙ্গারা সেখানে গিয়ে পূর্ণ চিকিৎসা নিতে পারে না। সরকারি
বড় হাসপাতালে তাদের প্রবেশ পদ্ধতিগতভাবে নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো
পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ নিতে পারে না। এমনকি
রোহিঙ্গা মহিলাদের জরুরি ধাত্রীবিদ্যা শেখানোর উদ্যোগ নিয়েও মিয়ানমার সরকারের
কাছে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে সেবা সংস্থাগুলো।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশ : মিয়ানমারে ধারাবাহিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের
শিকার হয়ে ১৯৭৮ সাল থেকে রোহিঙ্গারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে আসা শুরু করে। সর্বশেষ
২৫ আগস্ট-২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে চার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা
বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ২৫ আগস্ট ২০১৭ থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী দেশটির রাখাইন
রাজ্যকে রোহিঙ্গামুক্ত করতে যে সামরিক অভিযান শুরু করে, তার নামকরণ করা হয়
‘অপারেশন ক্লিয়ারেন্স’। এ অভিযানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে
জাপানের কুখ্যাত যুদ্ধকৌশল Three All Policy অনুসরণ করে। এ কৌশলের মূলকথা-
সবাইকে হত্যা করো, সবকিছু পুড়িয়ে দাও, সবকিছু লুট করো। এরপর থেকে সর্বশেষ ঢলের
মতো আসা শরণার্থীসহ বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর বর্তমানে মোট সংখ্যা ১০
লক্ষাধিক। রোহিঙ্গাদের মূল বাসভূমি রাখাইনের চেয়েও বেশি।
বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী : মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী ও বর্ণবাদীদের
দ্বারা রোহিঙ্গা বিতাড়ন শুরু হয় ১৭৮৪ সালে। এরপর ধারাবাহিকভাবে ১৯৪২, ১৯৭৮, ১৯৯২
এবং সাম্প্রতিক সময়ে কোনো একটি কারণ তৈরি করে তারা রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন করে। মূলত
১৯৭০ সাল থেকে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছাড়াতে শুরু করে। আর গত চার দশক ১৫-২০ লাখ
রোহিঙ্গা নিজ দেশ থেকে পাড়ি জমিয়েছে অন্যত্র। দেশ ছাড়া এ সকল রোহিঙ্গাদের প্রথম
পছন্দ বাংলাদেশ। এছাড়া মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ
বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তারা। শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা রিলিফওয়েব এবং
সংশ্লিষ্ট দেশের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে রোহিঙ্গা
জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ ৯ হাজার। দেশ অনুযায়ী রোহিঙ্গা
জনসংখ্যা-
দেশে দেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী
পাকিস্তান
|
|
সংযুক্ত আরব আমিরাত
|
|
যুক্তরাষ্ট্র
|
|
থাইল্যান্ড
|
|
ইন্দোনেশিয়া
|
|
আয়ারল্যান্ড
|
|
রোহিঙ্গা গণহত্যা ২০১৭ : ২৫ আগস্ট ২০১৭ সংঘটিত কথিত সন্ত্রাসী হামলার
জবাবে উত্তর রাখাইনে ভয়ংকর Scorched Earth বা পোড়ামাটি নীতিতে অভিযান
চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এতে রাখাইনে সেনা ও মগদের হাতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা
নিহত হয়। রাখাইনের মংড়ু, বুথিয়াডং ও রাথেদং শহরতলিতে মোট ৪৭১টি গ্রামের মধ্যে
নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ২১৪টি গ্রাম। ঐ তিনটি শহরতলিই ছিল রোহিঙ্গা মুসলিম
সংখ্যাগরিষ্ঠ। সাম্প্রতিক নিধন ও বিতাড়নের প্রধান শিকারও ছিল এসব অঞ্চল। গ্রামের
পর গ্রাম এমনভাবে জ্বালিয়ে ও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে সেখানে মানববসতির কোনো
চিহ্নই না থাকে। রাখাইনে ‘অপারেশন ক্লিয়ারেন্স’ নামের এ অভিযানে মিয়ানমার
সেনাবাহিনী ভয়ানকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। নির্বিচারে হত্যা, শিরশ্ছেদ, লোকজনকে
ঘরে বন্দি করে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা ও ধর্ষণের মতো বর্বরতম ঘটনা ঘটায় তারা। এমনকি
শিশুরাও সেনাবাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী, সরকার সমর্থক সশস্ত্র গোষ্ঠী ও
দাঙ্গাবাজদের সহিংস আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি।
রোহিঙ্গা সংকট ও বিশ্ববিবেক : শুরু থেকেই মিয়ানমার সেনাদের রাখাইন রাজ্যে
সাম্প্রতিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ (Genocide), আর ‘জাতিগত নিধন’ বলে অভিহিত
করে বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট থেকে বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ১১
সেপ্টেম্বর ২০১৭ জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে দেয়া এক বক্তৃতায়
The Office of the United Nations High Commissioner for Human Rights
(OHCHR)-এর প্রধান জাইদ রাদ আল হুসেইন বলেন, মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের
ওপর পরিকল্পিত নির্যাতনের মাধ্যমে জাতিগতভাবে তাদের নির্মূল করা হচ্ছে। তিনি
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অভিযানকে ‘পাঠ্যবইয়ের জাতিগত নির্মূল
অভিযানের নৃশংস উদাহরণ’ বলে অভিহিত করেন। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘও রাখাইনে জাতিগত
নিধনযজ্ঞ চলছে বলে বিবৃতি দেয়। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ রাখাইনে সহিংসতা বন্ধে জাতিসংঘ
নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মত বিবৃতি প্রধান করে। এর মাধ্যমে ৯ বছর পর রোহিঙ্গা
ইস্যুতে মতৈক্যে পৌঁছে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত : মিয়ানমারে রোহিঙ্গা
হত্যা-নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য
রাষ্ট্রের সমন্বয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে জাতিসংঘের মহাসচিব মিয়ানমারের প্রতি তিনটি
আহ্বান জানান। যথা :
১. শরণার্থীদের নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে দেয়া।
২. বাধাহীন ত্রাণ পৌঁছানো।
৩. অবিলম্বে রাখাইনে সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনার মূল বক্তব্য :
– কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে সব সদস্য।
– শান্তিরক্ষী পাঠানো বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুাব আসেনি।
– রাখাইন রাজ্যে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাকে সেখানে
যেতে দিতে হবে।
– সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান অর্জনের জন্য মিয়ানমার ও বাংলাদেশ, এই দুই প্রতিবেশী
দেশকেই সমঝোতার ভিত্তিতে এক যোগে কাজ করতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) ২৮টি দেশের পার্লামেন্ট ইউরোপীয় পার্লামেন্ট (EP) ১৪
সেপ্টেম্বর ২০১৭ ‘মিয়ানমার : বিশেষ করে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি’ শীর্ষক আলোচনা
শেষে ২০ দফা প্রস্তাব গ্রহণ করে।
আন্তর্জাতিক গণআদালত ও বিচার : রোহিঙ্গা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের
অভিযোগে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে স্থাপিত রোমভিত্তিক
Permanent Peoples Tribunal (PPT) নামের এক গণআদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া
শুরু হয়। বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাত বিশেষজ্ঞের একটি প্যানেল
অংশ নেয়। পাঁচদিনের বিচারকার্যে বিচারকরা প্রসিকিউশনের যুক্তি-তর্ক, বিশেষজ্ঞ
সাক্ষীদের মতামত, ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি বিচার-বিশ্লেষণ করেন। শুনানিতে বাংলাদেশ
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকও অংশ নেন। ট্রাইব্যুনালে
রোহিঙ্গা, কারেন সহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত
রাষ্ট্রীয় অপরাধের বর্ণনা দেন। ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সাত সদস্যের বিচারক প্যানেলের
সভাপতি আর্জেন্টিনার সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা দানিয়েল
ফিয়েরেস্তেইন গণআদালতের ‘প্রতীকী রায়’ ঘোষণা করেন। রায়ে মানবতাবিরোধী
অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, পুলিশ, অন্যান্য বৌদ্ধ মিলিশিয়া
ও দেশটির বর্তমান বেসামরিক সরকারকে অভিযুক্ত করা হয়।
সংকট নিরসনে পদক্ষেপ
আনান কমিশন ও সুপারিশ : বৈশ্বিক সমালোচনার মুখে মিয়ানমারের স্টেট
কাউন্সিলর অং সান সু চি ২৪ আগস্ট ২০১৬ রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতির উন্নয়নে গঠন করেন
‘রাখাইন উপদেষ্টা কমিশন’। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব ও নোবেল শান্তি পুরস্কারে
ভূষিত ঘানার নাগরিক কফি আনানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিশন
‘আনান কমিশন’
নামে পরিচিতি পায়। এ কমিশনের ৬ জন সদস্যই ছিলেন মিয়ানমারের নাগরিক। ২৪ আগস্ট ২০১৭
কমিশন তার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কমিশন তাদের চূড়ান্ত পতিবেদনে ৮৮টি সুপারিশ করে।
তার মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো :
– রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মিলে যৌথ যাচাই
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের নিরাপদে (বাংলাদেশ থেকে) প্রত্যাবাসন করতে হবে।
– ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে
হবে।
– মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনটি আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, নাগরিকত্ব ও জাতিগোষ্ঠীর
সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।
– জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অবাধ চলাচলের সুযোগ দিতে হবে।
– মিয়ানমারের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সব গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সদস্যদের সম্পৃক্ত
করতে হবে।
– সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে সুসম্পর্ক সৃষ্টি এবং সমাজের সব সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করতে হবে।
– সীমান্ত ইস্যুসহ অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সুসম্পর্ক
জোরদার করতে হবে।
আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মিয়ানমারে প্রেসিডেন্টের
দফতর থেকে দেয়া এক বিবৃতির মাধ্যমে গঠন করা হয় ১৫ সদস্যের ‘ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি
অব রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিটি’।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব : ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ বাংলাদেশের
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে সাধারণ পরিষদের ৭২তম
অধিবেশনের ভাষণে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে
জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি অবিলম্বে
মিয়ানমারের সহিংসতা ও জাতিগত নিধন নিঃশর্তভাবে বন্ধ করে শান্তি ও স্থিতিশীলতা
ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ৫টি প্রস্তাব পেশ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব :
১. অনতিবিলম্বে ও চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ
করা।
২. অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের নিজস্ব অনুসন্ধানী দল পাঠানো।
৩. জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে মিয়ানমারের ভেতরে
জাতিসংঘের তত্ত্ববধানে সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা।
৪. রাখাইন রাজ্য থেকে জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের
নিজেদের বাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
৫.কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত
করা।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, সময়ের সবচেয়ে আলোচিত সংকট হলো রোহিঙ্গা সংকট।
রোহিঙ্গা প্রশ্নে জাতিসংঘসহ বিশ্বনেতৃত্ব বাংলাদেশের পক্ষে থাকলেও এখন পর্যন্ত
রাশিয়া, ভারত ও চীন এ সংকট সমাধানে কার্যকরভাবে এগিয়ে আসেনি। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের
স্থায়ী সমাধান চোরাবলিতে পড়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু এ সমস্যায় বেশি ভুক্তভোগী তাই
তাকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যাতে আনান কমিশনের সুপারিশ,
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৫ দফা প্রস্তাব এবং নিরাপত্তা পরিষদের আহ্বানে
মিয়ানমার সাড়া দিয়ে চলমান অচলাবস্থার অবসান ঘটায়। নতুবা অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও
মিয়ানমার আরো বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখী পরিস্থিতির স্বীকার হবে।
আরো দেখুন :